banglanewspaper

আলোচিত রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান মামলার রায়ে আজ আদালত সাত জঙ্গির মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া একজনকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

আজ দুপুরে ঢাকার সন্ত্রাস দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনাল কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে এই রায় ঘোষণা করেন। রায়ের আদেশের সময় আট আসামিই আদালতে উপস্থিত ছিল।

মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামিরা হলো—রাকিবুল হাসান রিগ্যান, মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, মো. আবদুস সবুর খান, মো. আসলাম হোসেন র‍্যাশ, মো. হাদিসুর রহমান সাগর, মো.শরিফুল ইসলাম খালেদ ও মামুনুর রশিদ রিপন।

খালাস পাওয়া আসামি হলো মো. মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান।

যে সাতজনকে ফাঁসির দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে, তাদের অপরাধ সম্পর্কে মামলার অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা নাম ধরে ধরে অভিযোগের কথা উল্লেখ করেছেন।

এর মধ্যে রফিকুল হাসান রিগ্যান : জেএমবির সদস্যপদ গ্রহণ, সমর্থন, অর্থ গ্রহণ, প্রশিক্ষণ, হত্যাকাণ্ডে সহায়তা ও প্ররোচিত করা।

মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী : জেএমবির সদস্যপদ গ্রহণ, সমর্থন, অর্থ গ্রহণ, পরিকল্পনায় অংশগ্রহণ, হামলায় জড়িত দুজনকে সরবরাহ, ঘটনাস্থলে রেকি ও হত্যাকাণ্ডে সহায়তা করা।

মো. আবদুস সবুর খান : অর্থ গ্রহণ, অস্ত্র ও বিস্ফোরক পদার্থ সংগ্রহ, তৈরি ও সরবরাহ করে হত্যাকাণ্ডে সহায়তা করা।

মো. আসলাম হোসেন র‍্যাশ : জেএমবির সমর্থন সদস্যপদ গ্রহণ, সমর্থন, অর্থ লেনদেন, হামলাকারীদের পিক করে প্রশিক্ষণের কাছে পৌঁছে দেওয়া ও বোমা চার্জের প্রশিক্ষণ দেওয়া, ঘটনাস্থল রেকি, অস্ত্র বহন করে নিয়ে আসা, পরিকল্পনায় অংশগ্রহণ করে হত্যাকাণ্ডে সহায়তা ও প্ররোচনা।

মো. হাসিবুর রহমান : সমর্থন, অর্থ গ্রহণ, অস্ত্র গ্রেনেড সরবরাহ, হত্যাকাণ্ডে সহায়তা ও প্ররোচিত করা।

মো. শফিকুল ইসলাম খালেক : জেএমবির সমর্থন সদস্যপদ গ্রহণ, সমর্থন, অর্থ গ্রহণ, অর্থ লেনদেন, প্রশিক্ষণে সার্বিক সহায়তা এবং হামলার পরিকল্পনায় অংশগ্রহণ করা, হামলাকারীদের যথাস্থানে পৌঁছে দেওয়াসহ হত্যাকাণ্ডে সহায়তা ও প্ররোচনা করা।

মামুনুর রশিদ রিপন : সদস্যপদ গ্রহণ, সমর্থন, অর্থ গ্রহণ, অর্থ লেনদেন, হামলার পরিকলাপনা, হত্যাকাণ্ডের সহায়তা ও প্ররোচিত করা

অন্যদিকে খালাসপ্রাপ্ত আসামি মো. মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজানের ক্ষেত্রে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সদস্যপদ গ্রহণ, বিস্ফোরক দ্রব্য (জেল জাতীয় পদার্থ পদার্থ, যা বোমা তৈরির উপাদান) সরবরাহে সহায়তা করে হত্যাকাণ্ডের সমর্থন করা।

এর আগে রায়কে কেন্দ্র করে আজ আদালতপাড়া কঠোর নিরাপত্তার চাদরে ডেকে রাখা হয়। পুলিশ, র‍্যাব ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে কয়েক স্তরে এ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

চাঞ্চল্যকর এ মামলায় সরকারপক্ষে শুনানি করেন গোলাম ছারওয়ার খান জাকির। আসামিদের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট দেলোয়ার হোসেন।

মামলার শুনানি শেষে গত ১৭ নভেম্বর মামলার রায়ের জন্য দিন নির্ধারণ করেন আদালত। গত বছরের ২৬ নভেম্বর মামলাটির বিচার শুরু হয়েছিল ঢাকার সন্ত্রাস বিরোধী ট্রাইব্যুনালে।

এর আগে গত বছরের ২৩ জুলাই ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পরিদর্শক হুমায়ুন কবীর গুলশান হামলা মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে ২১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। এর মধ্যে আটজন আসামি ঘটনার পর বিভিন্ন অভিযানে এবং পাঁচজন হলি আর্টিজানে অভিযানের সময় নিহত হয়। বাকি আট আসামির উপস্থিতিতে আজ রায় ঘোষণা করা হয়।

হলি আর্টিজান অভিযানে নিহত  জঙ্গি

হলি আর্টিজানে হামলা পরবর্তী অভিযানে পাঁচ জঙ্গি নিহত হয়েছিল। তারা হলো রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, মীর সামেহ মোবাশ্বের, নিবরাস ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল।

বিভিন্ন অভিযানে নিহত 

হলি আর্টিজানর মামলার অভিযুক্ত আসামিদের মধ্যে বিভিন্ন ‘জঙ্গি আস্তানায়’ অভিযানে নিহত আটজন হলো তামীম আহমেদ চৌধুরী, নুরুল ইসলাম মারজান, তানভীর কাদেরী, মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম ওরফে মুরাদ, রায়হান কবির তারেক, সারোয়ান জাহান মানিক, বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট ও মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজান।

গুলশান হামলা নিহত হয়েছিলেন যাঁরা

হলি আর্টিজানে জঙ্গিরা গুলি করে ও গলা কেটে বিদেশি নাগরিকসহ ২২ জনকে হত্যা করেন। তাঁরা হলেন ইতালীয় নাগরিক ফেডো ট্রেডিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিসেস ক্লাওদিয়া মারিয়া ডি এন্তোনা (৫৬), মিসেস সিমোনা মন্টি (৩৪), স্টুডিও টেক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিসেস নাদিয়া বেনেডেট্টি (৫১) ও সুপারভাইজার মার্কো টোনডাট (৪১), একটি টেক্সটাইল গ্রুপের মাননিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাপক মিসেস আদেলে পুগলিসি (৫৫), ক্রিশ্চিয়ান রসি (৪৭), একটি টেক্সটাইল কোম্পানির মালিক ক্লাদিও ক্যাপেলি (৪৫), মিসেস ভিনসেনজো ডি অ্যালেস্ট্রো (৪৫) ও মিসেস মারিয়া রিবোলি (৩৩)।

নিহত জাপানি নাগরিকরা হলেন- মেট্রোরেল প্রকল্পের সমীক্ষা কাজে নিয়োজিত হিরোশি তানাকা (৮০), কোয়ো ওগাসাওয়ারা (৫৭), ইয়োকি সাকাই (৪২), নোবুহিরো কোরুসাকি (৪৯), মাকোটো ওকামুরা (৩২), রুই সিমোডাইরা (২৯) ও হিডেকি হাশিমোটো (৬৫)।

ভারতীয় নাগরিক- ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার ছাত্রী তারিশি জৈন (১৮)।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ও আমেরিকার দ্বৈত নাগরিক রাজধানীর গুলশান ২-এর ৫০ নম্বর রোডের বাসিন্দা মো. এহসানুল কবিরের মেয়ে অবিন্তা কবির (২০) এবং ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমানের নাতি ফারাজ আইয়াজ হোসেন (২০) নিহত হন।

অন্যদিকে ঘটনার শুরুতে জঙ্গিদের বোমার আঘাতে গুরুতর আহত হয়ে মারা যান বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাহউদ্দিন খান ও ঢাকা মহানগর (উত্তরের) গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি) রবিউল করিম।

অভিযানের সময় নিহত হন হলি আর্টিজান বেকারির দুই স্টাফ শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার কুলকাঠি গ্রামের হাসেম চৌকিদারের ছেলে সাইফুল চৌকিদার (৪০) ও নারায়ণগঞ্জ সদর থানার একরামপুর গ্রামের আব্দুস সাত্তার সরকারের ছেলে জাকির হোসেন শাওন (২২)।

মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাত পৌনে ৯টার দিকে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলা চালায় বন্দুকধারীরা। হামলার পর রাতেই তারা ২০ জনকে হত্যা করে। সেদিনই উদ্ধার অভিযানের সময় বন্দুকধারীদের বোমার আঘাতে নিহত হন পুলিশের দুই কর্মকর্তা। পরের দিন সকালে সেনা কমান্ডোদের অভিযানে নিহত হন পাঁচ হামলাকারী। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরেকজনের মৃত্যু হয়।

জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) এ হামলার দায় স্বীকার করে। সংগঠনটির মুখপত্র ‘আমাক’ হামলাকারীদের ছবি প্রকাশ করে বলে জানায় জঙ্গি তৎপরতা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘সাইট ইন্টেলিজেন্স’। যদিও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ দাবি করে, নব্য জেএমবির সদস্যরা এই হামলা চালিয়েছে।

এ ঘটনায় গুলশান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করে পুলিশ। মামলার পর নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাবেক শিক্ষক হাসনাত করিমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁকে দুই দফা রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়।

অন্যদিকে, এ মামলায় কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানা থেকে আটক রাকিবুল হাসান রিগ্যানকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তিনি এ মামলায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।