banglanewspaper

আমাদের মৌলিক চাহিদা গুলোর মধ্যে প্রথম স্থানটি খাদ্য এবং এই খাদ্যদ্রব্য মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সরকারের বর্তমান প্রচেষ্টা কে অবশ্যই সাধুবাদ জানাই। তবে মৌলিক চাহিদার দ্বিতীয় স্থানে থাকা বস্ত্র নিয়ে কিছু কথা না বললেই নয়।

পৃথিবীর সমস্ত জাতি নিজ নিজ ধর্ম বা গোত্রের বিশেষ দিনে নতুন বস্ত্র বা কাপড় পরে উৎযাপন করে। এটা যার যার আর্থিক অবস্থার উপর নির্ভর করে কেউ দামী আবার কেউবা একটু কমের মধ্যে পরিধেয় বস্ত্রটি কিনে নেন সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটিতে পরার জন্য। আর্থিকভাবে সচ্ছল বা অসচ্ছল যে যা ই হোক না কেন মূল উদ্দেশ্য সবার বিশেষ দিনে নতুন পোশাক চাই।

কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে পরিধেয় পোশাক বা পোশাক তৈরির যে কাপড় তার মান ভালো হলেও মূল্য খুবই হতাশাজনক। আজকাল বড় বড় মার্কেট ছেয়ে গেছে অরিজিনাল ইন্ডিয়ান কাপড়ে, তবে সে গুলোর দাম ও নিন্ম মধ্যবিত্তের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। আবার বাংলাদেশে তৈরি একটু ভালো মানের কাপড়ের পোশাক গুলোকে পাকিস্তানি পোশাক বলে প্রতিটি শপিংমল / মার্কেটের দোকানীরা দাম হাঁকাচ্ছে ন্যায্য মূল্যের চেয়ে শতগুণ বেশী।

কাপড়ের ব্যাপারে মোটামুটি ফ্যাসিনেশন থাকলে অথবা ফ্যাশন ডিজাইনিং এর উপর কিছুটা লেখাপড়া/ জ্ঞান থাকলে যে কেউ ই কাপড় দেখে এবং হাত দিয়ে মোটামুটি বুঝতে পারবে যে, সেই কাপড়ের মান এবং কোথাকার তৈরি সেসব সম্পর্কে।

বেশ কয়েক বছর থেকে দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে মেয়েদের ফ্রীপিস এর ক্ষেত্রে প্রথম পছন্দ পাকিস্তানি এবং ইন্ডিয়ান ক্যাটালগ থ্রীপিস অথবা লন। আর নারীদের পছন্দ ইন্ডিয়ান শাড়ি। তবে লজ্জাজনক হলেও সত্যি যে বর্তমান জিপিএ প্রজাতির সন্তানেরা নব্বই ভাগই কাপড় চেনে না। ওরা খোঁজে পাকিস্তানি বা ইন্ডিয়ান কিনা! এবং এই সুযোগটা লুফে নিয়ে অসাধু কাপড় ব্যাবসায়ীদের এখন পোয়াবারো অবস্থা। অসাধু দোকানীরা খোদ বাংলাদেশে তৈরি মোটামুটি মানের কাপড়ের রেপ্লিকা ফ্রীপিস গুলোকে পাকিস্তানি/ ইন্ডিয়ান ক্যাটালগ থ্রীপিস বলে চড়া দামে গছিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশের তৈরি সুতি কাপড়ের জামা সালোয়ারের পিসের সাথে সিন্থেটিক ওড়না বানিয়ে পাকিস্তানি লন বলে বিক্রি করছে। তবে কেউ যদি কাপড় চিনে ফেলে প্রতিবাদ করে, সে ক্ষেত্রে বাটপার দোকানীরা সব এক জোট হয়ে তাকে উল্টো অপমান করতে দ্বিধা করেনা।

এই প্রজন্মের মেয়েরা যে বোঝেনা শুধু তাই ই নয়, বোঝেনা তাদের অভিভাবকরাও। বাংলাদেশী কাপড় শুনলে তাদের যতো অবজ্ঞা আর নাক সিটকানো শুরু হয়ে যায়, অথচ বাংলাদেশের কাপড় সম্পর্কে তাদের কোন ধারণাই নেই। এই বাংলাদেশের কাপড়ের কদর সারা বিশ্বে ব্যাপক হলেও দেশের মানুষের কাছে সে নামের মূল্যায়ন নেই বিন্দুমাত্র। বাংলাদেশের কাপড় সম্পর্কে এই অনিহার জন্য আড়ং, ইয়োলো টাইপ হাউজ গুলোও দায়ী।

কারণ এই ধরণের হাউজ গুলোতে নিজস্ব পণ্যের নামে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে খুবই নিন্ম মানের কাপড় পাইকারী বাজার থেকে কম দামে কিনে এনে পোশাক তৈরি করে নিজ প্রতিষ্ঠানের একটা সিল লাগিয়ে ১২০ টাকার পণ্য ২৫০০ টাকায় বিক্রি করে। তার উপর আবার ওয়ানটাইম ইউজ টাইপ কাপড় যা এক ধোয়াতে রঙ চলে যায় অথবা ফেঁসে ন্যাকড়া হয়ে যাওয়ার কারণে ২০১৩ সালের পর দু' বছর দেশীয় বুটিক হাউজের প্রতি মানুষের আগ্রহ জন্মেছিলো সেই আগ্রহ আর থাকেনি। সে সব কারণ এখন মানুষ ভালো বলতে শুধু সিমান্তের বাইরের দেশের কাপড় বোঝে।

বাংলাদেশ উন্নত হচ্ছে বিশ্বের সাথে পাল্লা দিয়ে এটা যেমন সত্যি, ঠিক উল্টো দিকে আমাদের মানসিকতার অবনতি হচ্ছে তেমনই হতাশাজনক ভাবে। আমরা দেশকে মুখে বলি ভালোবাসি, অথচ দেশের পণ্য কেনার সময় এড়িয়ে যাই। আবার যখন বিদেশী বলে বাংলাদেশী পোশাক ঠকবাজরা বেশী মূল্য হাঁকায় তখন ঠিক সেটাই সানন্দে গ্রহণ করি।

আজকাল এই ঠকবাজি ভয়ানক আকারে বেড়েছে যার প্রমাণ প্রতিটি মার্কেটে গেলেই বোঝা যায়। অসৎ ব্যাবসায়ীরা এখন প্রতিটি দোকানে পাকিস্তানি এবং ইন্ডিয়ান ক্যাটালগ রাখে এবং কেউ ড্রেস দেখতে চাইলে আগে ক্যাটালগ ধরিয়ে দেয়। এবং সেই ক্যাটালগের ডিজাইন নকল করে বাংলাদেশে তৈরি ড্রেসই পাকিস্তানি বা ইন্ডিয়ান বলে চালিয়ে দেয় লাগামহীন দামে। এবং পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষটিকেই মেয়ের অথবা বউ এর আবদার মেটাতে বাধ্য হয়ে কিনে দিতে হচ্ছে নিজ দেশের পণ্য অন্য দেশের নামে অধিক দামে।

তাছাড়া আরো ভয়ানক ব্যাপার হচ্ছে একই কাপড় একই ডিজাইন একেক মার্কেটে একেক দাম। যেমন ইসলামপুরের গজ কাপড়ের দোকান গুলোতে উন্নত মানের যে কাপড় বিক্রি হয় গজপ্রতি ৩০০ টাকায়, সেই একই ডিজাইন একই মেটেরিয়ালের কাপড় চাঁদনীচক/ নিউমার্কেট / গাউছিয়া বা মৌচাকে দাম ৯০০ টাকা থেকে ১১০০ টাকা। আবার বসুন্ধরা শপিংমল, রাইফেলস এবং যমুনা ফিউচার পার্কে দাম হাঁকাবে ১৯০০ থেকে ২২০০ টাকা। দোকানী ব্যাবসায়ীদের যুক্তি হচ্ছে মার্কেটের পজিশন অনুযায়ী দাম নির্ধারিত হয়। কিন্তু এখানে আমার প্রশ্ন হলো পজিশন যতো ভালো হোক না কেন, গজপ্রতি এতো গুন বেশী টাকা নিয়ে তারা কাকে কি বোঝায়? এবং দূর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো এই বিষয় নিয়ে শুধু সরকার নয় কারোই কোন মাথা ব্যাথা নেই। সবাই যেন ওদের হাতে জিম্মি।

মৌলিক চাহিদার দ্বিতীয় নম্বরে থাকা এই পণ্য টির ক্ষেত্রে এমন অনিয়মের প্রতিকার কে করবে? তবে এই কারণেও বাংলাদেশে বিত্তবানেরা আরো বিত্তশালী হচ্ছে আর মধ্যবিত্ত থেকে নিম্ন মধ্যবিত্তরা হচ্ছে দরিদ্র। যার টাকা আছে সে কারখানার মালিক তার সাথে যোগ আছে ব্যাবসায়ীর, এই দু'পক্ষের যোগসাজশে চালাচ্ছে অরাজকতা। অন্যদিকে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত এবং দরিদ্র এই তিন শ্রেণীর মানুষকে ওদের খামখেয়ালী মার্কা দামে কাপড় কিনতে বাধ্য হতে হচ্ছে। যদিও উদাহরণ হিসেবে গজপ্রতি ৩০০ টাকার কাপড় নিয়ে বলা হচ্ছে। আসলে বাস্তবিকপক্ষে এর চেয়ে কম দামের কাপড়ের ক্ষেত্রেও এই একই অবস্থা।

শাড়ি কিনতে গেলে দেখা যায় সেটার হাল আরো খারাপ ইন্ডিয়ান শাড়িতে মার্কেট ঠাসা। তবে বাংলাদেশের তৈরি বিশ্বখ্যাত জামদানী শাড়ি ও আজকাল ইন্ডিয়ান জামদানী বলে চালানো হচ্ছে। মিরপুরের তৈরি কাতান চালাচ্ছে ইন্ডিয়ার বেনারশে তৈরি বলে। এক্ষেত্রেও বসুন্ধরা শপিংমল যে শাড়ির দাম নিচ্ছে ৩৫ হাজার থেকে ৩২ হাজার টাকা, অথচ সেই একই শাড়ি মিরপুরের বেনারশী পল্লী থেকে পাওয়া যায় ১৩ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকায়। এবং দামের এই জঘন্য হেরফেরের কারণে অনেকেই বাধ্য হচ্ছে ইন্ডিয়া গিয়ে কাতান শাড়ি / জামাকাপড় কিনে আনতে। সেখানে অন্তত বাংলাদেশের ব্যাবসায়ীদের মতো এতো বড় বাটপারি নেই। ওরা ওদের দেশের পণ্য অনেক কম দামেই বিক্রি করে বাংলাদেশীদের কাছে।

আরেক বাটপারি শুরু হয়েছে অনলাইন সেল গ্রুপ গুলোতেও। এখানে আবার সরাসরি অসাধু নারী ব্যাবসায়ী জন্ম নিয়েছে। মোটামুটি একটা ধাঁচের চেহারা আর একটু আহ্লাদী কন্ঠে কথা বলে ফেসবুক লাইভে এসে মার্কেটে যে পোশাক ১৫০০ টাকায় পাওয়া যায় সেই একই পোশাক তারা আপু আপু বলতে বলতে ২৫০০ টাকায় বিক্রি করে ফেলে খুব সহজেই সাথে পোশাক ডেলিভারি বাবদ ১০০ থেকে ৮০/৬০ টাকাও নিয়ে নিচ্ছে। এদের মধ্যে আবার অনেকে বিভিন্ন দোকানে গিয়ে ফেসবুক লাইভে ২০ টাকার পণ্য ৪৫ টাকায় বিক্রি করে দোকান মালিকের সাথে চুক্তি করে মানুষ ঠকাচ্ছে। নারী উদ্দোক্তা বলে এই ঠকবাজ নারীরা প্রশ্রয় পাক সেটা কাম্য নয়। এই নারীদের অনেকেই অবৈধ উপায়ে ইন্ডিয়া থেকে শাড়ি ফ্রীপিস আনছে সেখানেও সরকার কে ফাঁকি দিচ্ছে অন্যদিকে ভোক্তাকেও ঠকাচ্ছে।

পোশাক বা পরিধেয় বস্ত্র মূল্যের এই লাগামহীন অরাজকতা কি কোন ভাবেই বন্ধ করা সম্ভব নয়? ভোক্তা অধিকার আইন তো এক্ষেত্রে ও প্রযোজ্য, তবে কেন এই বিষয়ে আজ পর্যন্ত কারো কোন প্রতিবাদ চোখে পরেনি! কেন বারবার বিশেষ করে বিশেষ দিন কে মাথায় রেখে পরিধেয় বস্ত্র কিনতে গিয়ে এমন স্বেচ্ছাচারিতার স্বীকার হচ্ছি আমরা? এক পক্ষের প্রতিনিয়ত অন্যায়ে আশাহত হতে হচ্ছে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত এবং দরিদ্রদেরকে। কেন মার্কেট ভেদে দামের এমন নোংরা রাহাজানি? পজিশন ভেদে দামের উপর নিচ হতেই পারে তবে তারও নির্দিষ্ট লিমিট কে ঠিক করে দিবে?

ভেজাল বিরোধী বা শুদ্ধি অভিযান এবার এই ক্ষেত্রেও চালানো হোক। অন্যথায় সচেতন মানুষেরা সবাই শপিং করতে ইন্ডিয়া গিয়ে দেশের টাকা গুলো ওখানকার মার্কেটে দিয়ে আসবে। তবু এদেশে কাপড় ব্যাবসায়ীদের এমন আচরণ মেনে নিবেনা।

পবিত্র ঈদ কে সামনে রেখে সাধারণ মানুষের সাথে এমন ঠকবাজি বন্ধ করাণোর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। পোশাকের দামের এই লাগামহীন অরাজকতাকারী ব্যাবসায়ীদের / দোকানীদের বিরুদ্ধে আইনত ব্যবস্থা নেয়া সহ পণ্যের মূল্য সহনীয় পর্যায় রাখার ব্যবস্থা করা হোক। এবং বাংলাদেশী পণ্য নিজ দেশের নামে ন্যায্য দামে বিক্রি করা হোক, তাতে দেশের পণ্যের প্রতি ক্রেতার চাহিদা এবং সম্মান দু'টোই বাড়বে। এবং এসব বিশেষ দিন গুলোতে বিত্তবান থেকে শুরু করে দরিদ্র শ্রেণীর মানুষেরা ও নতুন পোশাকে নিজেদের সাজিয়ে নেয়ার আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে পারবে।

 

লেখিকাঃ
সাংবাদিক,
মাকসুদা সুলতানা ঐক্য।

 

 

 

 

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)