banglanewspaper

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর থেকে বিএনপির আগের জোট ২০ দলের নেতাদের মধ্যে বঞ্চনার বোধ জন্ম নিয়েছে। জামায়াত ছাড়া অন্য শরিকরা ভাবছেন, বিএনপি আর আগের মতো গুরুত্ব দিচ্ছে না তাদের। আর ‘মর্যাদার দাবি’ তুলে জোটের প্রধান দলটিকে কথাও শোনাচ্ছেন তারা।

২০ দলের নেতাদের অভিযোগ, ২০ বছর ধরে তারা জোটে থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় এখন তাদের সেভাবে পাত্তা দেওয়া হচ্ছে না। অন্যদিকে অক্টোবরে জোট করা এবং ভোটের রাজনীতিতে দুর্বল শরিকরাই পাচ্ছে গুরুত্ব।

এরই মধ্যে জোটের বৈঠকে বিএনপির শীর্ষ নেতাদেরকে তাদের মনঃক্ষুণ্নের কথা জানিয়েছেন শকিরদের কেউ কেউ। কেউ কেউ আবার প্রকাশ্যে দুই জোটের মধ্যে সমন্বয় করে সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠা করার তাগিদ দিচ্ছেন। অন্যথায় ‘নামকাওয়াস্তে’ না রেখে জোট ভেঙে দেওয়ারও পরামর্শ দিচ্ছেন বিএনপিকে।

যদিও বিএনপির পক্ষ থেকে বরাবরের মতো বলা হচ্ছে, জোটের ঐক্য অটুট আছে। নতুন-পুরনো সবার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অটুট আছে।

তবে এবার জোটের মধ্যে নিজেদের মর্যাদা ফিরে পেতে ‘হার্ডলাইনে’ যাওয়ার কথাও ভাবছেন ২০ দলের কোনো কোনো নেতা। সামনের দিনগুলোতে শরিকগুলোর মধ্যে নিবন্ধিত ও অ্যাকটিভ দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে স্টিয়ারিং কমিটি করার প্রস্তাব তৈরি করা হচ্ছে। জোটের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এই স্টিয়ারিং কমিটি গ্রহণ করবে। বাকিরা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে।

জোটের শরিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০ দলের আগামী বৈঠকে এই স্টিয়ারিং কমিটি করার প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে। প্রয়োজনে সংস্কার করে জোটের শরিকদের সংখ্যা কমানোরও পরামর্শ দেওয়া হবে।

একটি শরিক দলের সভাপতি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর থেকে আমরা অনেকটা বৈষম্যের শিকার হচ্ছি। অথচ আমরা পুরনো মিত্র। রাজনৈতিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। কিন্তু এভাবে চলতে দেওয়া যায় না। নিজেদের মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে প্রস্তাব দেওয়ার চিন্তা চলছে।’

এই নেতা বলেন, ‘সে ক্ষেত্রে জোটের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে স্টিয়ারিং কমিটি করার পরামর্শ থাকবে।’

২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে চারদলীয় জোটের পরিসর বাড়িয়ে ১৮ দলীয় জোট গঠন করে বিএনপি। পরে ২০১৪ সালে নির্বাচনের পর এরশাদকে ছেড়ে কাজী জাফর আহমদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি বিএনপির সঙ্গে যোগ দিলে ১৮ দলীয় জোট ১৯ দলে রূপ নেয়। ওই বছরের জুন মাসে সাম্যবাদী দলের একাংশ যোগ দিলে ২০ দলীয় জোটে রূপ নেয়।

বিএনপি জোটের অন্য দলগুলো হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফত মজলিস, বিজেপি, এলডিপি, কল্যাণ পার্টি, জাগপা, এনপিপি, এনডিপি, লেবার পার্টি, ইসলামিক পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাপ, মুসলিম লীগ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, পিপলস লীগ ও ডেমোক্রেটিক লীগ।

তবে গত ১৩ অক্টোবর গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে কয়েকটি দল নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়। ঐক্যফ্রন্টকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়। তবে ঐক্যফ্রন্ট গঠনের শুরু থেকে এ নিয়ে ২০ দলের শরিকদের মধ্যে অস্বস্তি ছিল। তাদের মতামত না নিয়েই বিএনপি ঐক্যফ্রন্ট করেছে এমন অভিযোগও ছিল কয়েকটি দলের শীর্ষ নেতাদের। নির্বাচনের আগে এমন অভিযোগে জোট ছাড়ে বিএনপির দুই পুরনো শরিক।

জোটের শরিকদের অভিযোগ, বহু চেষ্টায়ও যখন বিএনপির কাছ থেকে নির্বাচনে আসন ছাড় পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন হঠাৎ করে এসেই পছন্দমতো আসন পায় ঐক্যফ্রন্ট।

নির্বাচনের পর শরিকদের নিয়ে প্রথম বৈঠকে নিজেদের ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন। তবে এ ব্যাপারে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য দেননি বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা।

সাম্যবাদী দলের নেতা কমরেড সাঈদ আহমেদ বলেন, ‘আমার মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ে টিকলেও শেষ পর্যন্ত ঐক্যফ্রন্টের চাপে পেলাম না। অথচ আমরা বিএনপির পুরনো দিনের শরিক।’

‘জোটের বৈঠকে আমি বলেছিলাম ঐক্যফ্রন্টের ভারে ডুবতে বসেছে ২০ দল। কিন্তু কোনো উত্তর পাইনি।’

বিএনপি জোটের শরিক কল্যাণ পার্টির মহাসচিব আমিনুর রহমান নিজের ফেসবুকে ক্ষোভের কথা জানিয়ে পোস্ট দিয়েছেন। লিখেছেন, ‘২০ দলীয় জোটকে পাশ কাটিয়ে ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে তিন দফা কর্মসূচি দিয়েছে বিএনপি। যদি বিএনপির কাছে ২০ দলীয় জোট গুরুত্বহীন মনে হয়, তাহলে জোট বিলুপ্তির ঘোষণা দিলেই হয়। শুধু নামমাত্র জোট রেখে লাভ কী?’

এলডিপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, ‘ভোটের লড়াইয়ে ঐক্যফ্রন্টকে নিয়ে বিএনপি কতটুকু লাভবান হয়েছে, সেটা সবার কাছে পরিষ্কার। তবে তাদের যতটা গুরুত্ব দেওয়া দরকার, তার থেকে বেশি দেওয়া হচ্ছে। যদিও সেটা বিএনপির নিজস্ব ব্যাপার। কিন্তু পুরনো শরিকদের ভুলে গেলে তো চলবে না।’

‘নির্বাচনের পর তাদের সঙ্গে যতগুলো বৈঠক করেছে বিএনপি, সেখানে ২০ দলের সঙ্গে একটা বৈঠক হয়েছে। অথচ এখানে নিবন্ধিত দল বেশি। এরা পরীক্ষিত। এটা অস্বস্তিদায়ক।’

আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর-১ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে ভোটে লড়া এই নেতা বলেন, ‘পুরনো রাজনৈতিক সহকর্মীদের মূল্যায়ন দাবি করা হবে। প্রস্তাব থাকবে জোটের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে স্টিয়ারিং কমিটি করে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া। আগামী মিটিংয়ে এটা উত্থাপন করা হতে পারে।’

শরিকদের এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ২০ দলের সমন্বয়ক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘জোটের শরিকদের কোনো অভিযোগ থাকলে আমরা অবশ্যই তা মূল্যায়ন করব। অতীতেও সব সিদ্ধান্ত সবার মতামতের ভিত্তিতে হয়েছে। তারা আমাদের পুরনো বন্ধু। এখানে ভুল-বোঝাবুঝির সুযোগ নেই।’