banglanewspaper

ওমর ফারুক, বান্দরবান জেলা প্রতিনিধি : স্রষ্টার সৃষ্টির সেরা নিদর্শন পাহাড়-নদী। নদীকে কেন্দ্র করেই যুগে যুগে গড়ে উঠেছে হাজারো সভ্যতা। তার সৃষ্টির আরেক সৃষ্টি বান্দরবানের নাফাকুম ও রেমাক্রী জলপ্রপাত। পাহাড়ের কিনারা বেয়ে বয়ে চলা নদীর সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে চাইলে চলে যেতে হবে থানছির রেমাক্রী।

দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকরা এখন ভিড় করছে বান্দরবানের থানছি উপজেলার পাশাপাশি দুই ইউনিয়ন তিন্দু ও রেমাক্রী। জেলা শহরে নেমে চাঁদের গাড়ি নিয়ে তিন ঘন্টা পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে ছুটে যাচ্ছে বান্দরবান থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে থানছি উপজেলায়। সেখান থেকে অকটেন চালিত ইঞ্জিন বোটে চড়ে ২০কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রেমাক্রী। পাহাড়ি পল্লীতে রাত্রিযাপন শেষে পরদিন ৮কিলোমিটার পথ পায়ে হেটে পাড়ি দিয়ে চলে যাচ্ছে বাংলার নায়েগ্রা খ্যাত নাফাখুম ঝর্ণায়। রোমাঞ্চকর এ যাত্রায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ক্লান্ত পর্যটকরা নাফাখুমের সৌন্দর্য্য দেখে বিমোহিত আর মুহূর্তেই দূর হয়ে যায় সব ক্লান্তি। ঝর্ণায় গোসল করে তারা আবার সতেজ প্রাণবন্ত হয়ে যায়। তবে বর্ষাকাল হওয়ায় নদীতে পানি থাকায় এখন পায়ে হাঁটার কষ্ট অনেকটাই কমে গেছে। বোটে চড়ে বেশিরভাগ অংশই পাড়ি দেয়া যায়। শীতকালে সাঙ্গু নদীতে পানি শুকিয়ে যায় তাই পায়ে হেটে যেতে হয় পুরোটা পথ। তাই নাফাখুম যাওয়ার জন্য বর্ষাকালকেই বেছে নিচ্ছে পর্যটকরা। হাটার কষ্ট কম হওয়ায় নারী-পুরুষ-শিশু বৃদ্ধরাও ছুটে যাচ্ছে নাফাখুমের সৌন্দর্য দেখতে।

থানছি সদরে পৌঁছে পুলিশের কাছে পরিচয়পত্র অথবা এনআইডি কার্ড জমা দিয়ে নাম এট্রি করে নিতে হবে। বিজিবি ক্যাম্পে গিয়ে সেই নির্ধারিত ফরম জমা দিয়ে বোট ভাড়া করে যাত্রা শুরু করতে হবে রেমাক্রীর উদ্দ্যেশে। তবে সবার আগে একজন গাইড নিতে হবে। যে এসব কাজে সবধরণের সহযোগিতা করবে। দূর্গম জায়গা হওয়ায় নিজের নিরাপত্তার জন্য গাইড অত্যাবশ্যক।

থানছি সদর থেকে যাত্রা শুরু করে নদীর দুই পাশের সৌন্দর্য্য দেখতে দেখতে দুই ঘন্টায় পৌঁছে যাবেন রেমাক্রীতে। সেখানে রেমাক্রী জলপ্রপাতের সৌন্দর্য্য মুগ্ধ হওয়ার মত। ১০০কিলোমিটার যাত্রার ক্লান্তি দূর করতে নিজেকে ভিজিয়ে নিতে পারেন জলপ্রপাতের পানিতে। গোসল শেষ করেই উঠে যেতে পারবেন ভাড়া করা কটেজে। হা বিড়ম্বনা এড়াতে কটেজ অবশ্যই থানছিতে থাকা অবস্থায় বুকিং দিতে হবে। সেখানে সব কটেজই পাহাড়িদের। হাজার টাকায় মিলবে থাকার জন্য রুম। খাবার হোটেলও আছে। মুরগির মাংস, ডাল, আলু ভর্তা এসব পাওয়া যায়। দেড়শ টাকায় মিলবে একজনের খাবার। দূর্গম জায়গায় এমন খাবার পাওয়ায় খুশি পর্যটকরাও।

ঢাকা থেকে স্বপরিবারে বেড়াতে আসা পর্যটক সোনিয়া আক্তার বলেন, খুবই সুন্দর একটি জায়গা। যাওয়ার পথে নদীর দুপাশের দৃশ্যগুলো অসাধারণ। আসতে একটু কষ্ট হলেও নাফাখুমের সৌন্দর্য্য দেখে সব কষ্ট দূর হয়ে গেছে। এটার গল্প অনেক শুনছি, কিন্তু বাস্তবে এটা তার চেয়েও সুন্দর। এখানে না আসলে সেটা কখনোই বুঝা সম্ভব নয়।

ঢাকা থেকে বেড়াতে আসা আরেক পর্যটক আবু জাফর বলেন, এখানে অল্প টাকায় থাকার খুব সুন্দর ব্যবস্থা আর খাবারগুলো খুব সুস্বাদু। এতো দূরে এসে এত ভালো খাবার পাব, চিন্তাও করিনি। খাবারের দামও অনেক কম। তবে থাকার জায়গা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। সরকারীভাবে যদি আরো কিছু কটেজ করা হয় তাহলে আরো ভালো হত।

তিনি আরও বলেন, দিন দিন এখানে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। নাগরিক জীবনের ব্যস্ততা আর কর্মজীবনের ক্লান্তি ভুলতে ছুটির দিনে মানুষ ছুটে যাচ্ছে পাহাড় আর ঝর্ণার সৌন্দর্য্য দেখতে। মোবাইল নেট না থাকায় প্রাত্যহিক জীবনের কারো সাথে যোগাযোগও থাকবে না। নিশ্চিন্ত মনে উপভোগ করা যায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। পর্যটক পেয়ে খুশি সেখানকার ব্যবসায়ীরাও।

রেমাক্রী বাজারের ব্যবসায়ী ও ২নং তিন্দু ইউপি চেয়ারম্যান মং প্রু অং মার্মা  বলেন, পর্যটকের আনাগোনা আগের চেয়ে বেড়েছে। থাকার জায়গা দিয়ে সংকুলান করতে পারছি না। আগে তেমন আসতো না। তবে এখন বেশি পর্যটক আসায় আমাদের ব্যবসাও ভাল হচ্ছে। চেষ্টা করছি আরো কিছু কটেজ করার। যাতে পর্যটকরা আরামে থাকতে পারে।

তিনি বলেন, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কোন কারন নেই। বিজিবির পক্ষ থেকে রয়েছে সতর্ক নজরদারী। রয়েছে মোবাইল টহলও। আর পুলিশের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

পুলিশ সুপার জাকির হোসেন মজুমদার বলেন, পর্যটকদের জন্য বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কোথাও কোন পর্যটক হয়রানির শিকার হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য টুরিস্ট পুলিশের ভ্রাম্যমান টিম রয়েছে। এছাড়াও থানছির পর্যটকদের জন্য পুলিশের কাছে নাম এন্ট্রির ব্যবস্থা করা হয়েছে। যাতে কোথাও কোন পর্যটক মিসিং হলে সাথে সাথে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়।