banglanewspaper

আ.ফ.ম. মশিউর রহমান:
আজকের বাংলাদেশে সর্বাধিক আলোচিত বিষয় নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, যেটি শুরু হয়েছিল দু’জন কলেজ শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে। সড়কে এমন মৃত্যু নতুন কোনো ঘটনা নয়, প্রতিদিনই এমন প্রাণ ঝড়ছে। আর সেটি শুধু সড়কেই নয়, গুম, খুন, ক্রসফায়ারসহ আরো অনেকভাবে। শুধু সড়কে নজর দিলেই দেখতে পাই ডেইলি স্টারের তথ্য মতে ২০১৮ সালের প্রথম ছয় মাসেই সড়কে প্রাণ গেছে ২ হাজার ৪৭১ জনের। এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে আর বাকী ৩৭ শতাংশ ঘটছে চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে। ব্র্যাকের তথ্যমতে ৬৮ শতাংশ দুর্ঘটনার পেছনেই দায়ী বাস ও ট্রাক। এটি হচ্ছে দৃশ্যমান চিত্র যার পেছনে রয়েছে আরো নানাবিধ কারণ যার মধ্যে অন্যতম চালকদের অসুস্থ প্রতিযোগীতা, ফিটনেস বিহীন গাড়ি, অদক্ষ চালক, পর্যাপ্ত ও শৃঙ্খলিত রাস্তার অভাব, ট্রাফিক সিগন্যাল না মানা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব।

অতএব, যখনই কোনো দুর্ঘটনা হচ্ছে তখনই নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনসহ নানান পর্যায় থেকে কথা উঠছে আর কিছু দিনের মধ্যেই কিছু আশ্বাস আর তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে কিংবা অন্য কোনোর ইস্যুর তলে চাপা পড়ে সব আবার যেই সেই অবস্থায়ই ফিরে যাচ্ছে। তবে এবারের আন্দোলনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের একটি আন্দোলন যেখানে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা তাদের বিবেকবোধ ও দেশপ্রেমের জায়গা থেকে নিজেদের উদ্যোগেই এত বড় আন্দোলন গড়ে তুলেছে এবং সবার সাধুবাদ ও সমর্থন কুঁড়িয়েছে। এমনকি সড়কারের উচ্চ পর্যায়েরও অনেকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। যার দরুণ সবাই প্রত্যাশা করছিলেন এমন একটি অহিংস আন্দোলনই আগামীর বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে বড় ভূমিকা রাখবে, কিন্ত দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে গত দুদিন ধরে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে গড়াচ্ছে।

আমরা দেখতে পাচ্ছি এই অহিংস আন্দোলনেও ছড়িয়ে পড়ছে সহিংসতা, আবারো রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে জনপদ। রাতারাতি এই আন্দোলনের একটি বিরোধী পক্ষ তৈরি হয়ে গেছে। আর এ দেশের খুব সহজ বিষয়ই হচ্ছে এমন কিছু ঘটলে বিরোধী দল সরকারকে আর সরকার বিরোধী দলকে দোষারোপ করছে। আর সহজেই সব ধামাচাপা পড়ছে। নানান দিকে নানান বাতাস ছড়িয়ে পড়ছে, কেউ বলছে সত্য, কেউ বলছে গুজব। এখানেও যে বিষয়টি বড় হয়ে চোখে পড়ছে সেটি হলো মেইন স্ট্রিম মিডিয়ার ভূমিকা। যখনই মেইন স্ট্রিম মিডিয়া কোনো কিছুর সঠিক চিত্র তুলে ধরতে ব্যর্থ হয় তখুনি গুজবের সূচনা ঘটে যার পরিণতি ভয়ংকর পরিবেশের দিকে পুরো জাতিকে ঠেলে দেয়।

যদিও এখনো আশা করি চলমান আন্দোলনের ইস্যুটির একটি সুন্দর সুরাহা হবে বলে। তবুও প্রশ্ন থেকেই যায়। ধরা যাক এটির সুরাহা হলো, এটিই তো আর একমাত্র বিষয় নয়, রয়েছে এমন হাজারো ইস্যু। একটু তুলে না ধরলেই নয়। একটু পেছনে ফিরলেই দৃশ্যমান হয় কোটা সংস্কার আন্দোলন, যার সঠিক সমাধান এখনো পর্যন্ত হয়নি, সাগর-রুনি হত্যাকান্ডের বিচার এখনো হয়নি। প্রতিদিন পত্রিকা খুললেই দেখি খুন, ধর্ষণ, বিভিন্ন বিভাগের ঘুষ বানিজ্য, দখলবাজি এমনকি ব্যাংক থেকে অর্থ লোপাটের খবর। আর এর বাইরে রাজনৈতিক সহিংসতার তো শেষই নেই।

সুতরাং, শুধুমাত্র সড়কের নিরাপত্তা নয়, প্রতিটি মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ আজকের মৌলিক দাবী। আর সেটি নিশ্চিত না হলে রাষ্ট্রীয় কাঠামো দুর্বল হতে হতে এক সময় হঠাৎ করেই সার্বিক ব্যবস্থাপনাই ভেঙ্গে পড়বে।

আশার বাণী হচ্ছে, নিরাপদ সড়কের দাবিতে দলমত নির্বিশেষে সবাই যেরকম একমত হয়েছে ঠিক দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে অন্যান্য ইস্যুগুলোতেও যে সবাই একমত হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আর সেদিনই ভিত রচনা হবে একটি নিরাপদ বাংলাদেশের।


 
আ.ফ.ম. মশিউর রহমান 
কবি, সাংবাদিক ও গবেষক (এমফিল গবেষণারত)
moshiureu@gmail.com

 

 

 

 

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)