banglanewspaper

কোটা সংষ্কার আন্দোলনে উত্তাল সারাদেশের সকল ক্যাম্পাস। সকাল-সন্ধ্যা সরকারি চাকরিতে কোটা সংষ্কার প্রার্থীদের শ্লোগানে মুখর ক্যাম্পাস গুলো। আর এ আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।

এদিকে আবার সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা কোটা আন্দোলনকারীদের প্রতিহত করতে মারমুখী ভয়ানক অবস্থানে অটল। ইতোমধ্যে কোটা সংষ্কার প্রার্থীদের কয়েকজন নেতাকে মূমুর্ষূ করে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে রেখেছেন।

ক্যাম্পাস গুলোতে এমনিই আগুন, তার মধ্যে সরকার সমর্থিত গোষ্ঠি কেরোসিন ঢেলে আরো উত্তপ্ত করে তুলেছে। তাই দেশের কেন্দ্রে অবস্থিত ক্যাম্পাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ পদক্ষেপ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা কর্মচারি ব্যতিত অন্য কাউকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে দেয়া হবেনা। অনুমতি ব্যতিত প্রবেশ ও অবস্থান করলেই তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কিন্তু এতে চরম বিপাকে পড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে চা পান করতে আসা সন্ধ্যার অতিথিরা। বহু বাধা বিপত্তি পেরিয়ে সন্ধ্যা বেলায় টিএসসির চায়ের কাপে চুমুক দেয়া যেন তাদের নিকট জীবনযাপনের একটি অংশ। এখানকার চা ব্যতিত অন্য কোন জায়গার চা যাদের কাছে চা বলেই মনে হয় না। 

এ ঘোষণার পর চায়ের নেশা মাথায় উঠলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রবেশ করার সাহস পাচ্ছেনা টিএসসির এসব চা প্রেমীরা। শাহবাগ, পাবলিক লাইব্রেরি, জাদুঘরের আশপাশে এসেই তারা ঘুরাঘুরি করছেন। ফুটপাতের দোকানে চা পানও করেছে কয়েক বার। কিন্তু প্রতিবারই চায়ের নামে তারা দুধ মেশানো গরম পানি খেয়েছে। এই চা পান করে জিহ্বা ভারী হয়ে যাচ্ছে। ভারী জিহ্বার কারণে অনেকেরই বাকস্বাধীনতা হুমকির মুখে, স্বাভাবিক কথা বলতেও হিমশিম খাচ্ছে তারা।

এ ছাড়া অনেকেরই বন্ধুবান্ধব, ভাই-বোন, প্রেমিক-প্রেমিকা থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আগে তারা দেখা করতে ডাকলেই যে কেউ গিয়ে দেখা করতে পারতো। এখন উল্টো ক্যাম্পাসের বাসিন্দাদেরই যানজট ঠেলে বহুদূর পাড়ি দিয়ে কাঙ্খিত ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করতে হচ্ছে। এতে বরং শিক্ষার্থীদেরই সময় নষ্ট হচ্ছে। আর সময়ের সঙ্গে টাকাপয়সাও জলে যাচ্ছে।

অন্যদিকে এসব কারণে প্রেমিক-প্রেমিকাদের দেখা-সাক্ষাৎ কম হচ্ছে। ফলে ‘চোখের আড়াল তো মনের আড়াল’ সূত্র মেনে ইতিমধ্যে অনেক কোমলমতি প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্কে দেখা দিচ্ছে তীব্র টানাপোড়েন।

যার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষের নিকট তারা আকুল আবেদন জানিয়েছেন, উক্ত কারণগুলো বিবেচনা করে বহিরাগত চা-খোরদের টিএসসিতে গিয়ে এক কাপ চা পানের অনুমতি দিতে। উল্লেখ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার পরিবেশে যেন সামান্যতম বিঘ্ন না ঘটে, সে জন্য আমরা নিঃশব্দে চা পানের ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে দায়িত্ব নিয়েছেন তারা। আগে যারা চা পানের সময় শোঁ শোঁ শব্দ করত, তারাও শব্দ না করে চা পানের অনুশীলন করছে। এতে দুই-একজনের জিহ্বা পুড়ে গেলেও প্রায় সবাই নিঃশব্দে চা পানে সফল হচ্ছে।

কিন্তু পুরো পৃথিবীর সমস্ত চা রেখে এ টিএসসির চায়ের প্রতি কেন তাদের এত আকর্ষণ। কোন অতিরিক্ত ফ্লেভার থাকে এ চায়ে? কোন অতিরিক্ত উপদান ব্যবহার করা হয় এ চায়ের মধ্যে?

অথচ অন্যান্য চায়ের তুলনায় এ চায়ের অতিরিক্ত বৈশিষ্ট্য গুলো দৃশ্যমান হলেও সবাই যেন অদেখাই থাকে।

প্রথমত মানুুষের হাতের ছোঁয়ায় ধন্য টিএসসির এ চায়ের কাপগুলো। প্রতিটি মূহুর্তে এ কাপে চুমুক দেয় শ্রমের কষাঘাতে ঘামে সিক্ত রিকসা শ্রমিকরা। এ কাপগুলোতে চুমুক পড়ে সোহরাওয়ার্দী ও রমনা পার্ক থেকে ফেরত উত্তপ্ত প্রেমিকদের, যারা একটু আগেই গাছের আড়ালে, ঝোপ ঝাপে দু’জনের ঠোঁটের মহা মিলন ঘটিয়েছে। বার বার করে ধোয়ার পরও অধিকাংশ কাপে লেগে থাকে ছোপ ছোপ লিপষ্ট্রিকের লাল ছোঁয়া। দু’একটি ছাড়া টিএসসির সব কাপের গায়ে লেগে থাকে বিভিন্ন রঙের তৈলাক্ত লিপষ্ট্রিক।

সুতারাং কাপটি নিজেই একটি ইতিহাস, আর এ কাপ ও চায়ের সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত তারাও ইতিহাস বান্ধব। মোদ্দা কথা সহস্র শ্রমিকের কপাল গড়িয়ে আসা ঘাম, প্রেমে বেষ্টিত রমনীর ঠোঁটের লাল চাপ এবং চৌ ঠোঁটের মিলন মূহুর্তের দুষ্প্রাপ্য পরশ বাড়িয়ে দিয়েছে এ চায়ের কদর। 

মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মজুমদার

লেখক

কবি ও উপ সম্পাদক, দৈনিক আমাদের অর্থনীতি

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)