banglanewspaper

মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মজুমদার:

বার্তাকক্ষে দীর্ঘ সময় কাজ করে শরীরটাও বেশ ক্লান্ত। তখন শরতের একটি বিকাল। ক্লান্তি মিটাতে কাজের ফাঁকে আকাশটা একটু দেখতে বার্তাকক্ষ থেকে বের হলাম। লিফট দিয়ে নেমে রাস্তায় পা রাখতেই দেখি পাশে ভবনের নিরাপত্তা প্রহরীর সামনে দাড়িয়ে একটি ছেলে কাঁদছে। ছেলেটির বয়স ৭ অথবা ৮ বছর হবে।

আমি কয়েকবার প্রশ্ন করার পরও ছেলেটির নিকট থেকে উত্তর পাওয়া যাচ্ছেনা। সে কেঁদেই চলছে। গায়ের জামাও অর্ধেক ভেজে গেছে চোখের পানিতে। এরপর আবার জিজ্ঞেস করতেই বললো তার নাম রাকিব, ভবনের নিরাপত্তা প্রহরী তার শার্ট ছিড়ে ফেলেছে। সঙ্গে সঙ্গে শার্টের ছেড়া অংশও সে দেখাল। নিরাপত্তা প্রহরীও তা অস্বীকার করছেনা। 

তিনি ইচ্ছে করে ছেড়েননি, তিনি বললেন একটু ছেড়া ছিল, তার মাঝে টান লেগে বাকিটুকু ছেড়েছে। প্রহরী হয়ত তার দায়িত্ব পালনের দায়বদ্ধতা থেকেই তাকে সরানের চেষ্টা করেছিলেন। ছেড়ার পরিমানটা তেমন বেশি নয়। নিরাপত্তা প্রহরী ছেলেটিকে বার বার তাড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। তিনি রাকিবকে বলছে রাকিবকে বলছে মাসের শেষে এসে আমার নিকট থেকে একশ টাকা নিয়ে যাস।

তারপরও সে জোর করে দাড়িয়ে আছে। এলোমেলো চুল আর হাতে একটি থলে, গায়ের শার্টটিও খুবই পুরাতন ও ময়লাযুক্ত। পরে জানতে চাইলে সে বললো তার একটি মাত্র শার্ট, সেটিও এখন ছিড়ে গেল তাই এখন থেকে পরনের মতো তার কিছুই নেই।

তার চোখ থেকে অবিরত ভাবে অশ্রু ঝরছেই। কিন্তু আমার কাছে সেটি কোন চোখের অশ্রু মনে হয়নি। আমার মনে হয়েছে আকাশ আর পৃথিবীর মাঝখানে এক ভয়ষ্কর জলপ্রপাত থেকে ঝুম ঝুম করে জল প্রবাহিত হচ্ছে। পকেটে তখন কিছু টাকাও ছিল। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম রাকিবকে একটি জামা কিনে দিব।

পরে তার শার্ট ছেড়ার কষ্টের সঙ্গে আমি উল্টো আরো কিছু কষ্ট যোগ করে দিলাম। আশপাশে অনেক খোঁজার পরও শার্টের কোন দোকান পেলাম না। তাই শেষ পর্যন্ত তাকে আর শার্ট কিনে দেয়া হলোনা। তবে তাকে একটু দৃঢ় ও আত্মসংগ্রামী করার চেষ্টা করেছি।

রাকিব এক সময় স্কুলে যেত। কিন্তু দরিদ্রের কষাঘাতে এখন আর যাওয়া হয়না। শুধু বেঁচে থাকার সম্ভল যোগাতেই রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। কখনও করুণা করে কেউ কোন খাবার দেয়। আবার কখনও সাধ্য অনুযায়ী কারো কোন কাজ করে দিয়ে আহারের যোগাড় করে নেয়। রাকিব দরিদ্র হলেও যে শহরের রাস্তার ধারে দাড়িয়ে রাকিব জামা ছেড়ার বেদনায় কাঁদছে সে শহরের রাস্তাগুলোতে  বিলাশবহুল যানবাহনের যানজট প্রতিনিয়ত লেগেই থাকে।

আর রাস্তার দু’ধারে আকাশ ছোঁয়া বিশাল বিশাল অট্রালিকা। সে শহরের ময়লার পাত্র গুলোতে প্রতিদিনই দামি দামি পরিত্যাক্ত খাবার মানুষ ফেলে দেয়। সন্ধ্যা নেমে এলে শহরের অভিজাত শপিংমল গুলোতে পা ফেলবার জায়গা পাওয়া যায় না।

যে দেশে রাকিব একটি জামা ছেড়ার বেদনায় অশ্রু ঝরিয়ে পুরো বুক ভিজিয়ে ফেলেছে সে দেশের আইন সভায় প্রতিটি কয়েক ঘন্টার অধিবেশনের আপ্যায়নের বরাদ্দ লাখ লাখ টাকা। বিভিন্ন উৎসবে কয়েক কোটি টাকার আতশবাজি আর ফনুস বিস্ফোরণ হয় সে দেশের আকাশে।

যে যে রাষ্ট্রের রাস্তার ধারে রাকিব দাড়িয়ে জামা ছেড়ার বেদনায় কাঁদছে সে দেশের সরকারি আমলাদের মোবাইল সেট কেনার জন্য বরাদ্দ থাকে লক্ষাধিক টাকা। সে দেশের মন্ত্রীদের গাড়ী চলাচলের জন্যও রাস্তার মাঝে তৈরি হয় আলাদা লেন। সে দেশের খেলোয়াড়রা ছয়-চার মারার আগেই ফ্ল্যাট বরাদ্দের ঘোষণা এসে যায়।

আমরা প্রত্যেকই প্রতিনিয়ত দিন বদলের জন্যই চেষ্টা করতে থাকি, আর যারা জনপ্রতিনিধিত্ব করেন তারা তো দিন বদলের কাজেই নিয়োজিত থাকেন। আমৃত্যু স্লোগান দেন মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের। কিন্তু আমাদের জীবনে যে জিনিসটির সবচেয়ে কম পরিবর্তন হয় তা হলো আমাদের ভাগ্য।  

 

লেখক: কবি, সাংবাদিক ও উপস্থাপক

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলাদেশ নিউজ আওয়ার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)