banglanewspaper

আলফাজ সরকার আকাশ, শ্রীপুর (গাজীপুর) : সোমবার সকালে বারতোপা গ্রামে ঢুকেই দেখা গেল গ্রামের মানুষের ব্যস্ততা। কেউ লাকড়ি কুড়াচ্ছেন, কেউ মুড়ির চাল শুকাচ্ছেন। কেউবা মাটির খোলায় চালে উত্তাপ দিচ্ছেন। গরম বালুর পরশে তা মুড়মুড় করে ফুটে তৈরী হচ্ছে সুস্বাধু মুড়ি।প্রতিটি বাড়িতে মুড়ির তৈরীর ব্যস্ততা বলে দিচ্ছে এ যেন মুড়িরই গ্রাম। মুড়ি ফোটার শব্দের সাথে যেন জীবনের ছন্দ জড়িয়ে আছে তাঁদের। বছর ঘুরে রমজান মাস আসলেই ব্যস্ততা বেড়ে যায় গ্রামের বধুদের।  

বাঙালিদের ইফতারির প্রধান অনুষঙ্গ মুড়ি তৈরীতে ব্যস্ত হয়ে পরে তাঁরা। তবে যান্ত্রিক সভ্যতার এ যুগে হাতের ছোঁয়া ছাড়াও অধিকাংশ মুড়ি তৈরী হয়ে থাকলেও এখনও কদর রয়েছে হাতে ভাজা মুড়ির। ক্রেতাদের পছন্দের প্রতি সম্মান জানিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতা সত্বেও বছরের পর বছর ধরে এখনও টিকে রয়েছে গাজীপুরের শ্রীপুরের বারতোপা গ্রামের হাতে ভাঁজা মুড়ি তৈরীর শিল্প।

সারা বছর এই গ্রামের নানাজন নানা ধরনের কাজ করলেও রমজান আসার পুর্বেই নারী ও পুরুষরা মুড়ির তৈরীর কাজে লেগে যান। ক্রেতাদের বিষমুক্ত মুড়ি সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জীবিন ও জীবিকার তাগিদে তাঁরা এ পেশায় জড়িত হন। নারীরা চাল শুকানো থেকে ভাজার কাছ করে থাকেন। আর পুরুষরা সেসব বাজারের পাইকারী ব্যবসায়ীদের কাছে পৌছে দেন। সনাতন প্রক্রিয়ায় হাতে মুড়ি ভাজা যেন তাদের জীবনেরও একটা অনুষঙ্গ। হাতে ভাজা মুড়ির বিশেষ বিশেষণ হচ্ছে এতে প্রয়োগ নেই কোন ধরনের রাসায়নিক উপাদানের। শুধু চাউলে সামান্য লবন পানি মিশিয়ে তা ভেজে গরম বালুতে ছেড়ে দেয়া হয়। আর এতেই মুহুর্তের মধ্যেই তৈরী হয়ে যায় সাদামুড়ি।

বারতোপা গ্রামের গৃহবধু সাহারা খাতুন তিনি জানান, তাঁরা বংশানুক্রমিক ভাবে মুড়ির তৈরীর মাধ্যমে জীবিকা চালিয়ে আসছেন। কিন্তু যান্ত্রিক সভ্যতার এ যুগে তাঁদের সনাতনী এ পদ্ধতি এখন প্রায় অচল। তবে তঁদের তৈরী মুড়িতে কোন বিষাক্ত কিছু না থাকায় সচেতন লোকদের মধ্যে বিক্রি করা যায়। বাজারে যেখানে সাধারণ মুড়ি ষাট টাকায় পাওয়া যায় সেখানে তাঁদের হাতে তৈরী মুড়ি বিক্রি হয় একশত টাকায়।

তারই প্রতিবেশী আব্দুস সাত্তারের মতে, নানা কারনে এই গ্রামের অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে আসায় এখন আর আমরা টিকতে পারছি না। তবে পেশার মায়ায় এখনও কোনভাবে টিকে রয়েছি।

একই এলাকার গৃহবধু কমলা আক্তার জানান, এখানেও রয়েছে মধ্যস্বত্বভোগীদের আনাগোনা। গ্রামের অনেকেই হতদরিদ্র বিধায় যাঁদের পুঁজি নেই তাঁরা অনেকেই মহাজনদের সাথে মুড়ি ভাজার চুক্তি করেন। মহাজনরা শুধু ধানের যোগান দিয়ে থাকেন বাকী সব উপকরণ মুড়ি তৈরীর কারিগরদের দিতে হয়। ছয় মন ধানের মুড়ি ভেজে দিলে কারিগরদের দেয়া হয় তিন হাজার টাকা।

সত্তোরোর্ধ আয়েশা আক্তারের অভিমত বাজারে বড় ও ধবধবে মুড়ির চাহিদা বেশী। তাই অনেক কারিগর লবনের বদলে ইউরিয়া ও হাইড্রোজ মিশিয়ে মুড়ি ভেজে থাকেন। ফলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে হাতে ভাজা মুড়ির স্বাদ। তবে তাঁদের তৈরী মুড়িতে কোন বিষাক্ত রাসায়নিক প্রয়োগ করা হয় না। যা প্রয়োগ করা হয় কারখানাগুলোতে। 

একই এলাকার সোহরাব হোসেন জানান, তিনি বিগত চব্বিশ বছর ধরে রমজান উপলক্ষে মুড়ি তৈরী করছেন। কিন্তু এখন আর এতে তেমন লাভ পাওয়া যায় না। ক্রেতাদের অনুরোধে তিনি গত সাতদিন ধরে স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে মুড়ি তৈরী করছেন।

শ্রীপুর আব্দুল আউয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিষয়ের অধ্যাপক ফরহাদ তালুকদারের মতে,বর্তমান বাজারে যে ধবধবে সাদা মুড়ি পাওয়া যায় তার অধিকাংশতেই রাসায়নিকের মিশ্রন রয়েছে। যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। তবে সনাতন পদ্ধতিতে হাতে ভাজা মুড়িতে তেমন বিষের প্রয়োগ না থাকায় সচেতন মানুষের মধ্যে এর ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বারতোপা বাজারের মুড়ির আড়ৎদার মহর আলীর মতে, বছর পাচেঁক আগেও এই গ্রামের শতাধিক পরিবারের অন্যতম জীবিকা ছিল মুড়ির তৈরীকে কেন্দ্র করে। সময়ের বিবর্তনে এখন তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। তিনি বিভিন্ন ভাবে মুড়ির কারিগরদের সহায়তা করে থাকেন। আগে সারাবছর এই গ্রামে মুড়ি তৈরী হলেও এখন শুধু রমজান মাসকে ঘিরেই তা তৈরী হয়। হাতে ভাজা মুড়িতে প্রকৃত স্বাদ পাওয়া যায় বিধায় এসব মুড়ির চাহিদা বেশী। তবে হাতে মুড়ি তৈরীতে উৎপাদন খরচ বেশী হওয়ায় প্রতি কেজি একশ টাকা দরে বিক্রি করতে হয়। আর তিনি গ্রাম ঘুরে সংগৃহীত মুড়ি রাজধানীর ঢাকায় প্রেরণ করেন।