banglanewspaper

মো:মোজাম্মেল ভূইয়া, আখাউড়া (ব্রাক্ষণবাড়িয়া) প্রতিনিধি: আখাউড়া  রেলওয়ে ষ্টেশন চত্বরে খোলা আকাশের নিচে গড়ে উঠেছে নিরিবিলি হোটেল। ওইসব হোটেলে পাওয়া যাচ্ছে ভাত,সবজি,ডিম,মাছ,মাংস। এখানে সর্ব নিম্ম ১৫টাকা থেকে উপরে ৩০টাকায় খাবার খাওয়া যায়। 

এখানে স্বল্প দামে মাটিতে বসে খোলা আকাশের নিচে ভাত খাচ্ছেন অসহায় হতদরিদ্র, ছিন্নমুল ও নিম্ম আয়ের লোকজন। তবে হোটেলগুলো প্রচলিত অন্য হেটেলের চাইতে সম্পুন্ন আলাদা। এখানে নেই বসার চেয়ার, নেই কোন টেবিল, নিজে পাকুশি ও নিজেই পরিবেশন করে খাবার বিক্রি করছেন।

যে সমস্ত লোকজন এখানে ভাত খেতে আসেন তাদের পক্ষে প্রচলিত কোন হোটেলে গিয়ে ভাত খাওয়া সম্ভব নয়। অসহায় হতদরিদ্র, ছিন্নমুল ও নিম্মআয়ের লোকদের কাছে খোলা আকাশের হোটেল যেন একমাত্র ভরসা হয়ে দাড়িয়েছে।

আখাউড়া রেলওয়ে ষ্টেশন চত্বরে খোলা আকাশের নিচে নিরিবিলি হোটেল ব্যবসায় অনেক নারী ভাগ্য বদল করেছে। প্রচন্ড ইচ্ছা আর দৃঢ় মনোবলকে কাজে লাগিয়ে ভ্রাম্যমান হোটেল ব্যবসার মাধ্যমে সুফিয়া বেগম, জাহানারা, আলেয়া বেগমসহ অনেক নারী তাদের অভাব অনটনকে জয় করেছেন। 

দেশের পূর্বাঞ্চল রেলপথের ঐতিহ্যবাহী রেলজংশন হল আখাউড়া। এ জংশন ষ্টেশনের উপর দিয়ে আন্ত:নগর, মেইল ও লোকাল ট্রেন দিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তরে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী ভ্রমন করে থাকেন। কিন্তু ওইসব ট্রেন যাত্রীদের মধ্যে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, ছিন্নমুল ও নিম্মআয়ের হতদরিদ্র লোকজনও রয়েছে। তাছাড়া এই ষ্টেশনে অসহায় হতদরিদ্র ছিন্নমুল, ভাসমান অসংখ্য লোক রয়েছে। এ জংশন ষ্টেশনে সব চাইতে বেশী অসহায় হতদরিদ্র ভাসমান ছিন্নমুল লোকদের সমস্যার কোন শেষ নেই।

তাদের মধ্যে বেশী ভাগ লোকজনই শহরের কোন হোটেলে গিয়ে ভাত খাওয়া অসম্বব হয়ে দাড়িয়েছে। কারণ তাদের ভাত খাওয়ার জন্য যে টাকা দরকার তাদের কাছে সেই টাকা নেই। তাই তারা বাদ্য হয়ে বড় বড় হোটেলের বিপরীতে খোলা আকাশের নিচে স্বল্প দামে ভাত খেয়ে দিন কাটায়। 

ষ্টেশন এলাকায় বাদাম বিক্রেতা শামসু মিয়া বলেন, সারাদিন ২ থেকে আড়ায়শ টাকার বাদাম বিক্রি করা খুবই কঠিন। কোন বড় হোটেলে এক বেলা ভাত খেতে ৪০ টাকার উপর লেগে যায়। টাকার অভাবে বাদ্য হয়ে এখানে ২০টাকার মধ্যে ভাত খেতে হয়। 

ফজলু মিয়া বলেন, সারা দিন ভিক্ষা করে রাতের বেলায় এই  ষ্টেশনে থাকি। তাই এখানে কম টাকায় ভাত খেতে হয়। আমাদের মতো গরিব লোকদের জন্য এই হোটেল না থাকলে হয়তো না খেয়েই থাকতে হতো।

আখাউড়া রেলওয়ে ষ্টেশনের ২নং ফ্লাট ফরমের ওভার ব্রীজের নিচে তাকালেই চোখে পড়ে অনেক নিরিবিলি হোটেল।  ভাত,মাংস,ডিম, সবজি তরকারি নিয়ে মাটিতে বসে আছেন অনেক নারী। তাদের কাছে উপরে ৩০টাকা নিচে ১২টাকায় ভাত পাওয়া যায়। সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পযর্ন্ত চলে তাদের বেচা কিনা। খোলা আকাশের নিচে নিরিবিলি  হোটেল দিয়ে ভাগ্য বদল করেছে অনেক নারী। ওই সব নারীর মধ্যে রয়েছে সুফিয়া বেগম,জাহানারা, আলেয়া বেগমসহ অনেক নারী।

সুফিয়া বলেন আজ থেকে ৩০ বছর আগে নোয়াখালীর ছিদ্দিক মিয়ার সঙ্গে বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই স্বামীর শ্রম বিক্রির টাকায় সংসার চলতো। বিয়ের ১০ বছরের মাথায় দুই ছেলে রেখে স্বামী মারা যায়। ওই দুই ছেলে নিয়ে তিনি খুবই অসহায় হয়ে পড়েন। তার দু’চোখে অন্ধকার নেমে আসে। সমাজের কেউ তাকে কোন সাহায্য করেনি। সবাই তাকে অবজ্ঞা আর অবহেলা করেছে। চোখে আর কোন পথ না দেখে জীবন বাচাতে বাড়ি থেকে বের হয়ে পড়েন। বেঁচে থাকার তাগিদে তিনি আখাউড়ায় চলে আসেন।

কোন উপায় বুদ্ধি না পেয়ে নিম্ম আয়ের লোকদের স্বল্প টাকায় ভাত খাওয়া যায় এই বেভে ষ্টেশন  চত্বরে খোলা আকাশের নিচে ভাত বিক্রি শুরু করেন। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে তিনি এখানে এ ব্যবসা করে আসছেন। 

তিনি বলেন, তার এই নিরিবিলি হোটেলে ভাত, মাংস, ডিম, সবজি তরকারি রয়েছে। তিনি নিজেই বাসা থেকে রান্না করে নিজেই লোকদেরকে পরিবেশন করে খাওয়ান। ছিন্নমুল, অসহায় নিম্ম আয়ের লোকজন মাটিতে বসে খেতে কোন সংকোচ করে না। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পযর্ন্ত ১ হাজার টাকার উপর বিক্রি হয় বলে জানায়। খরচ বাদে দৈনিক ৩শ টাকার উপর আয় হয়।

উপজেলার সামনগর এলাকায় সুফিয়া (৫৫)  ভাড়া নিয়ে এখন সুখে শান্তিতেই দিনানিপাত করছেন। এখন তার দু:খের দিন শেষ হয়ে গেছে।

আরেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জাহানারা বলেন, ১০ বছর আগে বিয়ে হয়েছিল তার। স্বামী আখাউড়ায় হকারি ব্যবসা করে। কিন্তু তার একার আয়ে সংসার চলে না। সংসারে অভাব অনটন থাকায় প্রায় অনাহারে অর্ধাহারে কেটেছে তাদের প্রথম জীবন। এরপর জাহানারা নিজ উদ্যোগে ষ্টেশন এলাকায় খোলা আকাশের নিচে ভাতের হোটেল ব্যবসা  দিয়ে ভাগ্য বদল করেছে। তাদের মতো অনেকেই ভাত ব্যবসায় ঘুচিয়েছে সংসারের অভাব অনটন।